বিষণ্নতা (Depression)

শেয়ার করুন

বর্ণনা

বিষণ্নতা এক প্রকার মানসিক সমস্যা, যার কারণে একজন ব্যক্তি স্থায়ীভাবে দুঃখভারাক্রান্ত ও অনাগ্রহ বোধ করে থাকে। এই সমস্যাকে মেজর ডিপ্রেশন (major depression), মেজর ডিপ্রেসিভ ডিজঅর্ডার (major depressive disorder) ও ক্লিনিকাল ডিপ্রেশনও (clinical depression) বলা হয়। বিষণ্নতা আপনার অনুভূতি, চিন্তাভাবনা এবং আচরণের উপর প্রভাব ফেলতে পারে। এছাড়া এর কারণে বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হওয়ারও সম্ভাবনা থাকে। বিষণ্নতার কারণে আপনার দৈনন্দিক কার্যকলাপ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এবং জীবন অর্থহীন মনে হতে পারে। বিষণ্নতা কোনো সাধারণ মানসিক দুর্বলতা নয়। বিষণ্নতায় আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি ইচ্ছা করলেই এই সমস্যা থেকে মুক্ত হতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে এর নিরাময়ের জন্য দীর্ঘ সময় ধরে চিকিৎসা নেওয়ারও প্রয়োজন হয়। তবে ঔষধ গ্রহণ ও কাউন্সিলিংয়ের পর বিষণ্নতায় আক্রান্ত বেশিরভাগ ব্যক্তির অবস্থার উন্নতি ঘটে। এছাড়াও বিষণ্নতা নিরাময়ের জন্য আরও কিছু চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে।

কারণ

বিভিন্ন কারণে এই লক্ষণ দেখা যেতে পারেঃ যেমন-

অতিরিক্ত মদ্যপান (Alcohol abuse) অ্যালঝেইমার ডিজিজ (Alzheimer's disease)
দুশ্চিন্তা/উদ্বেগ (Anxiety) বিষণ্নতা (Depression)
বিষক্রিয়াজনিত হেপাটাইটিস (Hepatitis due to a toxin) ঔষধের অপব্যবহার (Drug abuse)
অস্বাভাবিক খাদ্যাভ্যাস (Eating disorder) সিজোফ্রেনিয়া (Schizophrenia)
ব্যক্তিত্বের ব্যাধি (Personality disorder) পোস্ট ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিজঅর্ডার (Post-traumatic stress disorder)
বাইপোলার ডিজঅর্ডার (Bipolar disorder) টারনার সিন্ড্রোম (Turner syndrome)
রেস্টলেস লেগ সিন্ড্রোম (Restless leg syndrome) হার্ট কনটিউশন (Heart contusion)
কনভারশন ডিজঅর্ডার (Conversion disorder) হান্টিংটন ডিজিজ (Huntington disease)
মারিজুয়ানা অ্যাবিউজ (Marijuana abuse) নিউরোসিস (Neurosis)
কনডাক্ট ডিজঅর্ডার (Conduct disorder) ডিজলোকেশন অফ দি এলবো (Dislocation of the elbow)
ডিজলোকেশন অফ দি রিস্ট (Dislocation of the wrist) ডিসোশিয়েটিভ ডিজঅর্ডার (Dissociative disorder)
ডিজথাইমিক ডিজঅর্ডার (Dysthymic disorder) কাপোসি সারকোমা (Kaposi sarcoma)
ফ্যাক্টিশাস ডিজঅর্ডার (Factitious disorder) অ্যালকোহল ইনটক্সিকেশন (Alcohol intoxication)
সোমাটাইজেশন ডিজঅর্ডার (Somatization disorder) অ্যাস্পারজারস সিন্ড্রোম (Asperger's syndrome)
অ্যাটেনশন ডেফিসিট হাইপারঅ্যাক্টিভিটি ডিজঅর্ডার (এ-ডি-এইচ-ডি) (Attention deficit hyperactivity disorder (ADHD)) অ্যাকিউট স্ট্রেস রিঅ্যাকশন/ডিজঅর্ডার (Acute stress reaction/disorder)
ব্যাসেট ডিজিজ (Behcet disease) সাইকোসেক্সুয়াল ডিজঅর্ডার (Psychosexual disorder)

সংশ্লিষ্ট লক্ষণসমূহ

এই লক্ষণের সাথে অন্যান্য যে সকল লক্ষণ দেখা যেতে পারে সেগুলো হলোঃ

 

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়

ঝুঁকিপূর্ণ বিষয়: 

গবেষকরা এমন কিছু বিষয় চিহ্নিত করেছেন যেগুলি বিষণ্নতার ঝুঁকি বৃদ্ধি করে। বিষয়গুলি হলোঃ 

·       শিশু বা কিশোর থাকা অবস্থায় বিষণ্নতায় ভোগা।

·       অ্যাঙজাইটি ডিজঅর্ডার, বর্ডারলাইন পারসোনালিটি  ডিজঅর্ডার (Borderline Personality) অথবা পোস্ট-ট্রম্যাটিক ট্রেস ডিজঅর্ডার (Post traumatic stress disorder) হওয়া।

·       মাদকাসক্তি।

·       আত্মমর্যাদাহীনতা, পরনির্ভরশীলতা, আত্মসমালোচনা করা ও হতাশাপ্রবণ হওয়ার মতো চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা।

·       ক্যান্সার, ডায়াবেটিস বা হৃদরোগের মতো গুরুতর বা ক্রনিক (chronic) কোনো রোগ হওয়া।

·       ঘুমের ঔষধ বা উচ্চ রক্তচাপের ঔষধের মতো নির্দিষ্ট  কিছু ঔষধ গ্রহণ করা।

·       ট্রমা বা মানসিক চাপ সৃষ্টিকারী কোনো ঘটনা ঘটা, যেমন- শারীরিক বা যৌন নিগ্রহণ, নিকটজনের মৃত্যু, সম্পর্কের জটিলতা ও আর্থিক সমস্যা।

·       বংশে/পরিবারে নেশাগ্রস্ত, আত্মহত্যাকারী, বিষণ্নতায় ভোগা ও বাইপোলার ডিজঅর্ডারে (bipolar disorder) আক্রান্ত ব্যক্তি থাকা।

যারা ঝুঁকির মধ্যে আছে

লিঙ্গঃ নারীদের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার গড়পরতা সম্ভাবনা থাকে। পুরুষদের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ১ গুণ কম।

জাতিঃ শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার গড়পরতা সম্ভাবনা থাকে। কৃষ্ণাঙ্গ, হিস্প্যানিক এবং অন্যান্য জাতির মানুষের মধ্যে এই লক্ষণ দেখা দেওয়ার সম্ভাবনা ১ গুণ কম।. 

সাধারণ জিজ্ঞাসা

উত্তরঃ বিষণ্নতা টিনএজারদের আত্মহত্যার তৃতীয় প্রধান কারণ। বিষণ্নতায় আক্রান্ত টিনএজারদের মধ্যে বিরক্তিবোধ, দুঃখভারাক্রান্ত হওয়া, পছন্দের বিষয়ে অনাসক্তি, খাদ্যাভাসে পরিবর্তন, মাদকাসক্তি, নীরবতা, বারবার মৃত্যু সম্বন্ধে কথা বলা ও বন্ধু্ত্ব ভাঙার মতো লক্ষণ দেখা যায়। এছাড়া বিষণ্নতার কারণে টিনএজারদের শরীরে বারবার ব্যথারও সৃষ্টি হতে পারে। 

উত্তরঃ গর্ভাবস্থায় অনেক নারীই বিষণ্নতায় ভুগে থাকে। এই সমস্যা সমাধানের প্রথম উপায় সাইকোথেরাপি। যেহেতু সাইকোথেরাপিতে ঔষধ ব্যবহার করা হয় না, তাই ঔষধ গ্রহণের প্রভাব গর্ভবতী নারীদের ভ্রুণের উপর পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। তবে অ্যান্টিডিপ্রেস্যান্ট (antidepressant) [ সাধারণত SSRIs (Selective Serotonin Reuptake Inhibitors)] গ্রহণ করা এই অবস্থায় অধিকতর কার্যকর। বিষণ্নতার কারণে গর্ভে থাকা শিশুর ক্ষতি হতে পারে। তাই এই ঝুঁকির ব্যাপারে সাবধান থাকা উচিৎ। প্রয়োজনে বিষণ্নতায় ভোগা গর্ভবতী নারীদের চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করা লাগতে পারে। 

উত্তরঃ থেরাপির মাধ্যমে বিষণ্নতা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। এ ব্যাপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। বিষণ্নতা নিয়ন্ত্রণের জন্য আপনি নিজে থেকে কিছু কিছু বিষয় অনুসরণ করতে পারেন, যেমন- নিয়মমাফিক জীবনযাপন, সঠিকভাবে ঘুমানো, ইতিবাচক বিষয় সন্ধান করা, সমগ্র দিনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ইতিবাচক বিষয়ের তালিকা করা ও আনন্দে থাকার চেষ্টা করা ইত্যাদি। 

হেলথ টিপস্‌

বিষণ্নতার চিকিৎসা নিজে থেকে সম্পূর্ণরূপে করা সম্ভব নয়। তবে মূল চিকিৎসা গ্রহণের পাশাপাশি নিম্নলিখিতি বিষয়গুলি অনুসরণ করা যেতে পারে:

  • চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলা: সাইকোথেরাপি সেশন বাদ দেওয়া উচিৎ নয়। এছাড়া আপনি যদি ভালো বোধ করেন তাহলেও চিকিৎসকের দেওয়া ঔষধ গ্রহণ করতে থাকুন। ঔষধ গ্রহণ করা বাদ দিলে বিষণ্নতার লক্ষণগুলি আবারও দেখা দিতে পারে।
  • বিষণ্নতা সম্পর্কে জানা: বিষণ্নতা সম্পর্কিত বিভিন্ন তথ্য জানলে আপনার মানসিক শক্তি বৃদ্ধি পাবে এবং আপনি সঠিকভাবে চিকিৎসা পদ্ধতি মেনে চলতে উদ্বুদ্ধ হবেন। আপনার পরিবারের সদস্যদেরও বিষণ্নতা সম্পর্কে জানতে বলুন যাতে তারা আপনাকে সাহায্য করতে পারে।
  • বিষণ্নতা সৃষ্টিকারী বিষয় সম্পর্কে সচেতন হওয়া: যে বিষয়গুলি আপনার বিষণ্নতা বৃদ্ধি করে সেগুলি সম্পর্কে চিকিৎসক বা থেরাপিস্টের সাথে আলোচনা করুন। বিষণ্নতার লক্ষণ বৃদ্ধি পেলে আপনি কি ব্যবস্থা নেবেন, সে ব্যাপারেও পরিকল্পনা করুন। লক্ষণগুলিতে বা আপনার অনুভূতিতে কোনো পরিবর্তন আসলে সে ব্যাপারে অবশ্যই চিকিৎসক বা থেরাপিস্টের সাথে আলোচনা করা উচিৎ। এছাড়া বিষণ্নতার লক্ষণ দেখা দিলে পরিবারের সদস্যদের সাহায্য করার কথা জানিয়ে রাখা প্রয়োজন।
  • ব্যায়াম করা: শারীরিক কার্যকলাপ বিষণ্নতার লক্ষণগুলিকে প্রশমিত করে। তাই বিষণ্নতা কমাতে হাঁটা, জগিং করা, সাঁতার কাটা, বাগান তৈরি বা আপনার পছন্দের অন্য কোনো কাজ করার অভ্যাস করতে পারেন।
  • মাদকাসক্তি ত্যাগ: স্বাভাবিকভাবে মনে হতে পারে যে মাদকদ্রব্য গ্রহণ করলে বিষণ্নতা হ্রাস পায়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে মাদকাসক্তির কারণে পরবর্তীতে বিষণ্ণতার লক্ষণগুলি আরও তীব্র রূপ ধারণ করে এবং বিষণ্নতার চিকিৎসা করা কঠিন পড়ে। আপনার মাদকাসক্তি থাকলে এ ব্যপারে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।