Hospital News

‘টার্কিশ-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডাশিপ ওয়ার্ড’ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল

ক্যান্সার নামক কর্কট রোগের কথা শুনলেই সবাই প্রথমেই মৃত্যু ভয়েই আতংকগ্রস্থ হয়ে যায়। আর তা যদি হয় নিজের পরিবারের কেউ তাহলে তো কথাই নেই। আমরা ভেঙ্গে পড়ি দুর্ভাবনায়, রোগের কারণে এবং চিকিৎসার ব্যয়ভারের কথা চিন্তা করে। যারা আর্থিকভাবে সচ্ছল অধিকাংশই ভাবেন রোগীকে দেশের বাইরে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানোর। আর যারা আর্থিক ভাবে অসচ্ছল তারা দিশেহারা হয়ে পড়েন। বর্তমানে আমাদের দেশেই স্বল্পমূল্যে ক্যান্সার রোগীদের অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু করেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীদের জন্য নবনির্মিত ওয়ার্ডের নাম ‘টার্কিশ-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডাশিপ ওয়ার্ড’। তুর্কি এবং বাংলাদেশ সরকারের যৌথ অর্থায়নে ক্যান্সার আক্রান্তদের জন্য দেশে বিশ্বমানের সেবা প্রদানের লক্ষ্যে এটি নির্মান করা হয়েছে। ক্যান্সার ওয়ার্ডটি তৈরিতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং টার্কিশ কো- অপারেশন এন্ড কো- অরডিনেশন এজেন্সি যৌথভাবে কাজ করে।

এই ওয়ার্ডটি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে অগ্রণী ভুমিকা রাখেন প্রফেসর ডাঃ মোঃ ইয়াকুব আলী, প্রফেসর ডাঃ আবুল আহসান এবং প্রফেসর ডাঃ উত্তম কুমার বড়ুয়া। ২০১৭ সালের ২০ শে ডিসেম্বর তুরস্কের প্রধান মন্ত্রী বাইনালি এলদেরিম এই ওয়ার্ডটি উদ্বোধন করেন। ওয়ার্ডটি চালু হয় ২০১৮ সালের ৪ ই ফেব্রুয়ারি।
শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত এই ওয়ার্ডটি আধুনিক সরঞ্জামাদি দিয়ে তৈরি হয়েছে। ওয়ার্ডটিতে রয়েছে ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী ও তাদের সাথে আগতদের ক্যান্সার বিষয়ে গণসচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে অটো ডিসপ্লে সিস্টেম এবং চিকিৎসক চার্টার। রয়েছে রিসেপশনসহ নানা আধুনিক সুবিধা।

কেমোথেরাপির ডে কেয়ার রুমে বেডের সংখ্যা আটটি। আর পুরো ওয়ার্ডে মোট বেড রয়েছে ষাটটি। বর্তমানে এই ওয়ার্ডে রোগীর সংখ্যা পঞ্চাশ এর বেশি। এই ওয়ার্ডে দুইজন অধ্যাপক, দুইজন সহকারী অধ্যাপক, পাঁচ জন মেডিকেল অফিসার ও ইন্টার্নি চিকিৎসক আছেন। রোগীদের সেবায় নিয়োজিত আছেন ১৫ জন নার্স। আয়া আছেন ১ জন। দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা নেন এমন রোগীরা ক্যান্সার ওয়ার্ডের অন্য অংশে ভর্তি হন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের অন্যান্য ওয়ার্ডের চেয়ে এটি একটি ব্যতিক্রমী ওয়ার্ড। অটোলকড কাঁচের দরজা। ওয়ার্ডের ভিতরে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তা দিচ্ছেন দুজন আনসার। ওয়ার্ডটির গেট দিয়ে ভিতরে ঢুকতেই লম্বা লবিতে রয়েছে রোগীর অ্যাটেন্ডেন্টদের বসার ব্যবস্থা। অত্যাধুনিক এই ওয়ার্ডটি দুই ভাগে বিভক্ত। একটি অংশ কেমোথেরাপি নিতে আসা রোগীদের জন্য। এখানে ডে- কেয়ার সিস্টেমে চলে চিকিৎসা। অর্থাৎ রোগীরা কেমোর পর বিশ্রাম নিয়ে সেদিনই বাসায় চলে যেতে পারেন।

শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রফেসর ডাঃ উত্তম কুমার বড়ুয়া উপলব্ধি করেন এই হাসপাতালে যেসব ক্যান্সার আক্রান্ত রোগী কেমোথেরাপি নিতে আসেন কেমো দেওয়ার পর তারা খুবই কষ্ট পান। তাদের কষ্ট লাঘব করার জন্য এই ওয়ার্ডটি নির্মানের উদ্যোগ গ্রহন করা হয়।

‘টার্কিশ-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডাশিপ ওয়ার্ড’ এর চিকিৎসা সেবা গ্রহনের জন্য রোগীকে প্রথমে একটা সিরিয়াল নিতে হয়। অনকোলজি বিভাগে রোগীকে ডায়াগনোসিস করানো হয়। এরপর নূন্যতম একটা সার্ভিস দিয়ে রোগীকে ইনডোরে ভর্তি হতে হয়। রোগীকে এক থেকে তিন দিন এমনকি আট দিন পর্যন্ত কেমোথেরাপি দেওয়া হয়ে থাকে। এই ওয়ার্ডে ত্রিশ থেকে পঁয়ত্রিশ জন রোগীকে একসাথে কেমোথেরাপি দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। ডে কেয়ারে রোগীকে কেমোথেরাপি দেওয়ার সময় সার্বক্ষণিক একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এবং দুই জন নার্স থাকেন। এই হাসপাতালে গরীব রোগীদের জন্য ফ্রি কেমোথেরাপি দেওয়া হয়।

চিকিৎসা নিতে আগত রোগীদের শারীরিক সেবার পাশাপাশি মানসিক সেবা নিশ্চিত করতে ওয়ার্ডের সামনে রয়েছে একটি বাগান। যাতে এ ধরনের রোগীরা মানসিক আবসাদে না ভোগেন।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘দেশের কোন আধুনিক বড় হাসপাতালে এই ধরনের অত্যাধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই। দেশের বাইরে গিয়ে আর এ রোগের চিকিৎসা গ্রহন করার প্রয়োজন হবে না। দক্ষ ও যোগ্য ক্যান্সার রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎকরা এই হাসপাতালে রোগীর সেবা প্রদান করেন’। যদি কোন কারণে এই ওয়ার্ডে রোগী বেড না পান তাহলে রোগীকে অন্য ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। কেমোথেরাপি দেওয়ার সময় তাকে ওয়ার্ডে আনা হয়। এই চিকিৎসায় কর্তব্যরত সকল চিকিৎসক খুবই আন্তরিক।

ব্রেস্ট ক্যান্সার নিয়ে ভর্তি হয়েছেন তাহমিনা রহমান। তিনি বলেন ‘আমি গত তিন বছর আগে থেকে এই হাসপাতালে ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছি। এই হাসপাতালের চিকিৎসা খুবই ভালো। এখানকার চিকিৎসক ও নার্সরা ভালো ব্যবহার করেন।

অপর এক রোগী জাহানারা বেগম ক্যান্সারে আক্রান্ত। তবে কি ধরনের ক্যান্সার তা এখনো জানা যায় নি। এজন্য পরীক্ষা- নিরীক্ষা চলছে। তিনি বলেন ‘আমি গতকাল ভর্তি হয়েছি। এখানে এসি থাকায় কষ্ট কম হয়। তাছাড়া ওয়ার্ডের পরিবেশও পরিষ্কার- পরিছন্ন। তাই এখানে থাকতে কোনো অসুবিধা হয় না।

শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ‘টার্কিশ-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডাশিপ ওয়ার্ড’ এক নতুন দ্বার উন্মোচন করেছে। ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীরা খুবই সল্পমূল্যে এই ওয়ার্ড থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহ্ন করে থাকেন। গরীব অসহায় রোগীদেরকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা সেবা দেওয়া হয়।

Previous Post

Comments are closed.