ENT

ঘুমের মাঝে নাক ডাকা, নাক ডাকার কারণ এবং এর সম্ভাব্য প্রতিকার

আমাদের দেশে প্রচলিত একটি ধারনা আছে। সেটা হল নাক ডেকে ঘুমালে নাকি ভাল ঘুম হয়, রাজা বাদশারা নাকি নাক ডেকে ঘুমাতেন। এটা একটা ভুল ধারনা। নাক ডাকা একেবারেই ভাল কিছু নয়। এটি কোন অসুখ অথবা কোন অসুখের উপসর্গ। আমাদের ঘুমের সময় শ্বাসনালীতে বাধার সম্মুখীন হলে তাকে নাক ডাকা বলে।

নাক ডাকার সাথে আর একটা জিনিস ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সেটি হল নিশ্বাস নিতে না পারা। ঘুমানোর সময় কেউ যদি ১০ সেকেন্ড শ্বাস নিতে না পারে আমরা সেটাকে এপনিয়া বলে থাকি। এই এপনিয়া ১ ঘণ্টায় কতবার হল সেটা আমরা এপনিয়া ইনডেক্স দিয়ে মেপে থাকি। আমরা যখন নিশ্বাস নেই তখন বাতাস আমাদের ফুসফুসের ভিতর দিয়ে রক্তের সাহায্যে সারা শরীরে প্রবাহিত হয়। বিশেষ করে মস্তিষ্কে যেখান থেকে আমাদের শরীরের সমস্ত কার্যাবলী সম্পন্ন হয়। সে মস্তিষ্ককে পরিচালিত করতে সাহায্য করে। কিন্তু যখনই পথে বাধা হয় তখন নাক ডাকে। যখন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হয় তখন মস্তিষ্কে পর্যাপ্ত অক্সিজেন খাবার সরবরাহ হয় না। ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়াটা বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে বলে থাকে। আমরা এভাবে বলতে পারি যদি কারো 1 ঘন্টায় 5 থেকে 20 বার নিশ্বাস আটকে যায় তাহলে আমরা এটাকে মোটামুটি পর্যায়ের ধরি। আবার যদি কারো কারো 20 থেকে 40 ভাগ পর্যন্ত নিশ্বাস আটকে যায় তখন আমরা তাকে মাঝামাঝি পর্যায়ে ধরি। কিন্তু যখন কারো 40 বার বা তার বেশি সময় নিশ্বাস আটকে যায় তাহলে আমরা তাকে গুরুতরভাবে আক্রান্ত হিসেবে ধরি। প্রশ্ন হলো এই যে নাক ডাকা অথবা ঘুমের মধ্যে নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া এটি কেমন করে হয় সেটি জানা কিন্তু খানিকটা দরকার আছে যদি সহজ করে বলি এই নাক ডাকা কেন হয় আমাদের মুখের ভিতরে যে শক্ত তালু আছে তার পিছনে নরম তালু আছে সে নরম তালু এবং খাদ্যনালীর উপরের যে জায়গাটা যেটাকে ফ্যারিংক্স বলে। সে ফ্যারিংক্স যে দেয়ালটা আছে যেটা মাংসপেশী দিয়ে তৈরি সেখানে যখন বাধা পেয়ে পেয়ে বাতাস যায়, ধাক্কা খায়। সেখান থেকেই এই আওয়াজটা তৈরি হয় এবং আওয়াজটা যখন তৈরি হয় এবং যাদের তৈরি হয় আমরা কিন্তু দেখেছি তাদের শরীরে বিভিন্ন রকমের প্রভাব পড়ে। কী কী ধরনের প্রভাব পড়ে ? যেমন রাতে ঘুম কম হয়। একজন মানুষের স্বাভাবিক কতটুকু ঘুমের দরকার তার থেকে কম ঘুম হয়। সকালবেলা যখন উনি ঘুম থেকে উঠে তখন তার ঘুম ঘুম ভাবটা থেকে যায়। কারও কারও মাথাব্যথা হয়। কারো কারো মেজাজ খিটখিটে হয়ে যায়। কাজে মনসংযোগ করতে পারেনা এবং এটার জন্য যেটি হয় রক্তচাপ বেড়ে যায়, হাইপারটেনশন হতে পারে। তারপরে হৃদযন্ত্রের যে ছন্দে ছন্দে পতন ঘটতে পারে। তাছাড়া যেটি হয় একজন মানুষ যদি ক্রমাগত রাতজাগতে থাকলে, নাক ডাকতে থাকলে, নিঃশ্বাসের অসুবিধা হতে থাকলে সে মানুষটি তার কাজের জায়গাতে মনসংযোগ করতে পারেনা। তখন তার কাজের গুণগত মান ভীষণভাবে ব্যাহত হয়। যিনি গাড়ি চালান তার পথে দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, যিনি শিক্ষকতা করেন সে হয়তো ছাত্রদের ঠিকমতো পড়াতে পারেন না, ছাত্র-ছাত্রীদের যখন এরকম ঘটনা ঘটে তখন তারা পড়াশোনায় ঠিকমতো মনোনিবেশ করতে পারেন না, কাঙ্ক্ষিত ফলাফলটা তারা কিন্তু একেবারেই অর্জন করতে পারেন না। প্রশ্ন হল কোন কোন ক্ষেত্রে নাক ডাকবে ? নাকের ভিতরে যেই দেয়ালটা থাকে সেটি যদি ভীষণ রকমের বাকা হয় তাহলে নাক ডাকতে পারে। নাকের ভিতর স্পর্শকাতর জায়গা আছে। এলার্জির কারণে যদি সেখানে মাংসপেশী ফুলে পথ বন্ধ হয়ে যায় তাহলে নাক ডাকবে। অন্যদিকে যাদের গলার ভিতর বড় বড় টনসিল থাকে, শক্ত তালুর পিছনে যে নরম তালু আছে সেটি ভীষন নরম। আলাজিভ যেটি আছে সেটি ভীষণ রকমের বড়, সবকিছু মিলে নিঃশ্বাসটা নিচের দিকে যেতে পারে না। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে কেমন হয় সেটি বলি। শিশুদের বেলায় যেটি হয় গলায় টনসিল থাকে, মুখের পিছনে যে যে টনসিল থাকে যেটিকে আমরা অ্যাডিনয়েড বলি সেই অ্যাডিনয়েড যদি অস্বাভাবিক রকমের বড় হয়ে যায় তখন বাচ্চারা ক্রমাগত মুখ দিয়ে শ্বাস নেয়। একদিকে নাকডাকা, অন্যদিকে শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়া। এইযে ভীতিকর পরিবেশ এটি থেকে আমাদের কিন্তু মুক্তি পেতে হবে। কারণ আমি শুরুতেই বলেছি নাক ডাকার কারণে, শ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে কি কি অসুবিধা হতে পারে। এর কারনে একজন মানুষ কিন্তু ঘুমের মধ্যে মৃত্যুবরণ করতে পারে। কাজেই এধরনের সমস্যা যাদের থাকে তাদের তো সমাধান করতেই হবে। এখন এ ধরনের রোগীকে আমরা কিভাবে সুস্থ করে তুলবো। প্রথমেই আমরা রোগীর কাছ থেকে রোগের বিবরণ, কতদিন ধরে হচ্ছে, কখন বুঝতে পারলেন এই সমস্যা হচ্ছে ? তার কাছের মানুষদের কাছ থেকেও তাঁর সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। অন্যদিকে নাক কান গলা পরিক্ষা করতে হয়। Ct scan, ECG MRI এমআরআই যাদের বেলায় যেটি প্রযোজ্য সেই পরীক্ষাগুলো করতে হয়। তাছাড়া একটি বিশেষ ধরনের পরীক্ষা আছে যেটি একটি বিশেষ রুমে করতে হয়। ওই রুমে রোগীকে এক রাত থাকতে হয়। সেই পরীক্ষাটার মাধ্যমে রোগীর শরীরের সামগ্রিক তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যায় এবং সেগুলো দেখে একজন স্লিপ স্পেশালিস্ট যে এই বিষয় নিয়ে কাজ করেন সে সমস্ত কিছু মূল্যায়ন করে তিনি তার মন্তব্য দেন এবং তারপর নাক কান গলা বিশেষজ্ঞরা সেই রিপোর্ট দেখে রোগীর পরবর্তী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। তাছাড়া কিছু খাদ্যাভ্যাসের ব্যাপার থাকে। যারা রাতের বেলায় মদ্যপান করেন, যাদেরকে ঘুমের ওষুধ খেতে হয়, যারা অনেক দেরি করে ঘুমাতে যান রাতে তাদের অনেকেরই কিন্তু নাক ডাকা এবং ঘুমের মাঝখানে উঠে যাওয়ার ব্যাপারটা থাকে। রোগ থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা গ্রহণ করতে হয়। অন্যদিকে এই রোগ থেকে পরিত্রাণের জন্য জীবনযাপনের কিছু অভ্যাস আছে যেটি অনেকক্ষেত্রে পরিবর্তনের প্রয়োজন পড়ে। যাদের বাড়তি ওজন আছে তাদের অতিরিক্ত ওজন কমিয়ে ফেলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে এই রোগ থেকে মুক্তি পেতে পারেন। অন্যদিকে যাদের নাকের হাড় বাঁকা আছে তাদের অপারেশনের মাধ্যমে বাঁকা হাড় সোজা করে ফেলতে হবে। যাদের নাকের ভিতর মাংস বেশি আছে তাদের সেই ফোলা মাংস কমানোর ব্যবস্থা করতে হবে, যাদের অ্যালার্জি আছে তাদের এলার্জির জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, ধুলোবালি পরিহার করতে হবে, মাথার বালিশ একটু উঁচু করে শুতে হবে, রাতের খাবারটা একটু আগে খেতে হবে, ঘুমোনোর আগে একটু হেঁটে নিতে হবে। কারন ঘুম ঘুম ভাব নিয়ে office করা, গাড়ি চালানো এগুলো খুব খারাপ অভ্যাস। নাক ডাকা থেকে বাঁচতে হলে দেরি না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে, পরীক্ষা করাতে হবে এবং এই রোগের চিকিৎসা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে কিন্তু থেকে আমরা আশা করি আগামী দিনগুলোতে যাদের এই রোগ নিয়ে কষ্ট আছে তারা সুষ্ঠু চিকিৎসা গ্রহণ করে নিজেদের খারাপ অভ্যাসগুলো ত্যাগ করে সুস্থ থাকতে পারবেন

Next Post

You Might Also Like

2 Comments

  • Reply monjurul islam April 15, 2018 at 5:40 pm

    is dr. md nazmul islam sir is available in DHAKA MEDICAL COLLEGE? if yes then what is the schedule?? please reply..

    • Reply admin April 15, 2018 at 6:20 pm

      He is available daily without friday 08am-2pm at Dhaka medical college hospital. Thanks for comment.keep in touch with rx71health.com. Be safe& Be healthy…

    Leave a Reply